Bahumatrik | বহুমাত্রিক

সরকার নিবন্ধিত বিশেষায়িত অনলাইন গণমাধ্যম

চৈত্র ১৪ ১৪৩১, শনিবার ২৯ মার্চ ২০২৫

ছায়ানটে ফুলেল শ্রদ্ধায় সিক্ত সন্‌জীদা খাতুন

বহুমাত্রিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬:৩২, ২৬ মার্চ ২০২৫

প্রিন্ট:

ছায়ানটে ফুলেল শ্রদ্ধায় সিক্ত সন্‌জীদা খাতুন

ছবি: বহুমাত্রিক.কম

সকলের অশ্রুসজল চোখ, হৃদয়ে স্বজন হারানোর শোক আর হাতে ফুলের তোড়া- সন্‌জীদা খাতুনের শেষবিদায়ে ছায়ানট সংস্কৃতি ভবনে ঢল নেমেছিল হাজারো মানুষের। শাহীন সামাদ, বুলবুল ইস‌লাম, লাইসা আহ‌মেদ লিসা, পার্থ তানভীর ন‌ভেদ, রু‌চিরা তাবাসসুমসহ অন্যরা ধরা গলায় গাইলেন, ‘তুমি যে সুরের আগুন লাগিয়ে দিলে মোর প্রাণে’, ‘কান্না হাসির দোল দোলা‌নো’।

শেষবারের মতো সংস্কৃতি অঙ্গনের অগ্রণী ব্যক্তিত্ব, সংগীতজ্ঞ সন্‌জীদা খাতুনের মরদেহ ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবনে নেওয়া হ‌লে শো‌কের আবহ তৈরি হয়। বুধবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে সেখানে মরদেহ পৌঁছালে শ্রদ্ধা জানান তার সহকর্মী, সংস্কৃতিকর্মী, সাংবাদিক, শিল্পী, ছায়ানটের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মীসহ হাজার মানুষ। ছায়ানটে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে প্রথমে তার দীর্ঘদিনের কর্মস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে, তারপর দুপুর আড়াইটার দিকে মরদেহ নেওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে।

এদিন সন্‌জীদা খাতুনকে শেষবারের মতো দেখতে সকাল থেকেই ছায়ানট ভবনে আসতে শুরু করেন সঙ্গীতপ্রেমীসহ নানা অঙ্গনের মানুষ। এ সময় রবীন্দ্র সঙ্গীত ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’ পরিবেশন করেন শিক্ষার্থীরা। ফুলেল শ্রদ্ধায় ভরে উঠে সন্‌জীদা খাতুনের মরদেহ রাখার বেদী।

প্রসঙ্গত, বাঙালি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা, ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সভাপতি সন‌্জীদা খাতুন মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তার বয়স হয়েছিল  ৯২ ছুঁই ছুঁই।

‘আগুনের পরশমণি’ ও জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে ছায়ানটের উঠানে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন শেষ করা হয়।

ছায়ানটে তাকে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন ফাহমিদা খাতুন, রা‌মেন্দু মজুমদার, খুর‌শীদ আলম, শাহীন সামাদ, সেলিনা মা‌লেক চৌধুরী, ইফফাত আরা দেওয়ান, মিনু হক, খায়রুল আনাম শাকিল, শামীম আরা নীপা, শিবলী ম‌হম্মদসহ আরও অনেকে।

সংগঠনের মধ্যে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেছে সু‌রের ধারা, বাংলা‌দেশ মু‌ক্তিযুদ্ধ মঞ্চ, ঢাকা থিয়েটার, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, কণ্ঠশীলনসহ আরও কয়েকটি সংগঠন।

ছায়ানট থেকে তার দীর্ঘদিনের কর্মস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে কফিন নেওয়া হয়। এরপর বেলা আড়াইটায় কফিন নেওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে, সেখানে বিকেল চারটা পর্যন্ত তাকে শেষবিদায় জানান সর্বস্তরের মানুষ।

সেই পর্ব শেষে কফিন আবার নিয়ে যাওয়া হবে হিমঘরে। তবে এর পরের কার্যক্রম নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছে পরিবার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা ও জাতীয় অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেনের মেয়ে সন‌্জীদা খাতুনের জন্ম ১৯৩৩ সালের ৪ এপ্রিল। সন‌্জীদা খাতুন পড়াশোনা করেছেন কামরুন্নেসা স্কুল, ইডেন কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং শান্তি নিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করে ১৯৭৮ সালে সেখান থেকেই পিএইচডি করেন। দীর্ঘদিন অধ্যাপনার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ থেকে তিনি অবসর নেন।

সন্‌জীদা খাতুনের লেখার একটি বড় অংশ জুড়ে আছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ব্যাপক পরিসরে জনমানসে কবিগুরুকে পৌঁছে দেওয়ার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে তার। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় শুদ্ধ সংগীতের চর্চার পাশাপাশি বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় ছিলেন সন্‌জীদা খাতুন, তখন সহযোদ্ধাদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘মিনু আপা’ নামে।

গত শতকের ষাটের দশকের শুরুর দিকে বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি নিবেদিত প্রতিষ্ঠান ছায়ানটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সন্‌জীদা খাতুন। তার তত্ত্বাবধানে ছায়ানট এখন বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান, যা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও নৃত্যের প্রসারে কাজ করছে। ছায়ানটের পাশাপাশি জাতীয় রবীন্দ্র সংগীত সম্মিলন পরিষদেরও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তিনি। প্রচলিত ধারার বাইরে ভিন্নধর্মী শিশুশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নালন্দার সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। এশিয়াটিক সোসাইটির সাম্মানিক ফেলোও ছিলেন তিনি।

একাধারে শিল্পী, লেখক, গবেষক, সংগঠক, সংগীতজ্ঞ ও শিক্ষক সন্‌জীদা খাতুন ভারত সরকারের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘পদ্মশ্রী’ খেতাবে ভূষিত হয়েছেন। একুশে পদক, বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার, রবীন্দ্র স্মৃতি পুরস্কারে (পশ্চিমবঙ্গ, ভারত) ভূষিত সন্‌জীদা ১৬টি বই লিখেছেন। ‘সাংস্কৃতিক মুক্তিসংগ্রাম’ বইটি তার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, বাঙালির সাংস্কৃতিক সংগ্রামের প্রামাণ্য ইতিবৃত্ত এবং মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক তার একান্ত ভাবনাগুচ্ছ ধারণ করেছে।

Walton Refrigerator Freezer
Walton Refrigerator Freezer